এক দশকের রাজত্বের অবসান, মেসি-রোনালদোর দিন ফুরোচ্ছে কি ?

0
133

মেসি-রোনালদোর দিন বুঝি ফুরিয়ে আসছে।
লিওনেল মেসি একাই ৬ বার। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একা জিতেছেন দুবার। লুইস সুয়ারেজ ১ বার। বাকি একবার রোনালদো ও সুয়ারেজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এই মৌসুমের আগের দশ বছরে ইউরোপের লিগগুলোতে সেরা গোলদাতার পুরস্কার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-র তালিকায় এই তিনজনেরই জয়জয়কার। দশকের এই দাপটের অবশেষে হলো অবসান। মেসি, রোনালদো বা সুয়ারেজ নন, এই মৌসুমে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু পেয়েছেন ইতালিয়ান ক্লাব লাৎসিওর স্ট্রাইকার সিরো ইম্মোবিলে।

চোটের কারণে মৌসুমের প্রথম দুমাসের বেশিরভাগটাই খেলতে না পারা মেসি এবার দৌড়ে সেভাবে ছিলেনই না। বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড স্প্যানিশ লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন বটে, তবে লিগ শেষ করেছেন ২৫ গোল নিয়ে। যদিও ইদানিং বার্সেলোনায় খেলা গড়ায় বেশি মনোযোগ দেওয়া মেসি এবার লিগ রেকর্ড ২১টি গোল গড়ে দিয়েছেন। তবে পুরস্কারটা তো আর গোল গড়ে দেওয়ার নয়, গোল করার, তাতে মেসি পিছিয়ে ছিলেন। ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-র দৌড়ে শেষ পর্যন্ত ৫০ পয়েন্ট নিয়ে হয়েছেন পঞ্চম।

তবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো অঙ্কের হিসাবে অন্তত একেবারে কাল ইতালিয়ান লিগ মৌসুমের শেষ দিনটি পর্যন্ত ছিলেন। লিগে জুভেন্টাসের শেষ ম্যাচে কাল রোমার বিপক্ষে রোনালদোকে একাদশে রাখেননি জুভ কোচ মরিসিও সারি, তাতেই নিশ্চিত হয়ে যায় রোনালদোর এবার আর ইতালিয়ান লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা বা ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু—কোনোটিই জেতা হচ্ছে না। একইসঙ্গে এ-ও নিশ্চিত হয়ে যায়, দুটি পুরস্কারই যাচ্ছে ইম্মোবিলের হাতে। ৩০ বছর বয়সে এসে ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতলেন ইম্মোবিলে, ২০০৬-০৭ মৌসুমে রোমার ফ্রান্সেসকো টট্টি একা জেতার পর এই প্রথম পুরস্কারটিতে স্প্যানিশ লিগে খেলা কোনো ফুটবলারের ভাগ নেই।

ADVERTISEMENT
লিগে নিজেদের শেষ ম্যাচে কাল নাপোলির কাছে ৩-১ গোলে হেরেছে লাৎসিও, তাতে লাৎসিওর একমাত্র গোলটি ইম্মোবিলের। রোনালদো জুভের হয়ে না খেলায় ম্যাচের আগেই মৌসুমে ইতালিয়ান লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া নিশ্চিত হয়ে যায় ইমোবিলের। লিগে যে ইমোবিলের চেয়ে রোনালদোর গোল (৩১টি) ম্যাচের আগেই ছিল ৪টি কম। রোনালদো না খেলায় ইতালির সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি নিশ্চিত হয়ে যায়, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-ও যাচ্ছে ইমোবিলের হাতে। ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-র দৌড়ে দুইয়ে থাকা রবার্ট লেভানডফস্কির (৩৪ গোল) চেয়ে ম্যাচের আগেই ১ গোল এগিয়ে ছিলেন ইমোবিলে।

ম্যাচে গোল করে দুটি পুরস্কারের পাশাপাশি রেকর্ডে ভাগ বসিয়েই লিগ শেষ করেছেন ইম্মোবিলে। ২০১৫/১৬ মৌসুমে নাপোলির জার্সিতে গঞ্জালো হিগুয়াইনের ৩৬ গোল ছিল এতদিন ইতালিয়ান লিগে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। কাল সেই নাপোলিরই বিপক্ষে ১ গোল নিয়ে লিগে এবার ইম্মোবিলের গোলও হলো ৩৬টি। এত অর্জনের রাতে ৩০ বছর বয়সী ইতালিয়ানের আনন্দ যেন আর ধরে না। বিশেষ করে যেখানে কয়েক মৌসুম আগেই বরুসিয়া ডর্টমুন্ড ও সেভিয়ার জার্সিতে গোলের জন্য ধুঁকে মরার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। লাৎসিও স্টাইল চ্যানেলে কাল ম্যাচের পর উচ্ছ্বসিত ইম্মোবিলে বললেন, ‘অনেক বেশি খুশি আমি। যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে অনেক গর্বিত। বিশেষ করে পেছন ফিরে যেখান থেকে শুরু করেছি, যেসবের মধ্য দিয়ে গেছি সেদিকে যখন তাকাই। আসলে কী, আপনার যদি বিশ্বাস অটুট থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে স্বপ্ন আসলেই সত্যি হয়।’

ইম্মোবিলের স্বপ্ন তো সত্যি হলো, মেসি-রোনালদোর কি তবে রাজত্বের দিন শেষ হয়ে আসছে? ২০২০ সালে এসে অতিমানবীয় হারে গোল করেছেন বটে রোনালদো, কিন্তু সেটি কতদিন চলবে? পর্তুগিজ মহাতারকার বয়স যে ৩৫ ছাড়িয়ে ৩৬-এর দিকে চলছে! মেসি এই মৌসুমে চোটের সঙ্গে অনেকটা সময়ই লড়াই করেছেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে চোট নিয়েই খেলে গেছেন বলে জানিয়েছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম। কিন্তু করোনা বিরতি থেকে ফেরার পর তাঁর কিছু গোলের সুযোগ হারানোর দৃশ্য চোখে লেগেছে। আর্জেন্টাইন মহাতারকার বয়স রোনালদোর মতো না হোক, তবে ৩৩ চলছে।

এবারের গোল্ডেন শু জিতেছেন ইম্মোবিলে। ছবি: এএফপি
রোনালদো শারীরিক উচ্চতার কারণে হেড করার অবিশ্বাস্য দক্ষতা আর বক্সে উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে গোল করছেন। যত বয়স হয়েছে, তত উইং ছেড়ে প্রতিপক্ষ বক্সের দিকে এগিয়েছেন ‘সিআরসেভেন।’ যে কারণে এখন তাঁকে দলের খেলা গড়ার চেয়ে সুযোগগুলো গোলে রূপান্তর করতেই বেশি দেখা যায়। আর মেসি? হাঁটছেন রোনালদোর উল্টো দিকে। তাঁর বড় শক্তি প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যুহ ভেদ করা, খেলা গড়ে দেওয়া। যে কারণে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মাঠের আরও নিচের দিকে নামছেন বার্সা ফরোয়ার্ড। মাঝমাঠ থেকে দলের খেলা গড়ার দিকেই সামনে আরও বেশি মনোযোগ দেবেন তিনি—এমনই ইঙ্গিত দিয়ে গেছে মেসির এবারের মৌসুম।

রোনালদোর বয়স, মেসির বয়সের পাশাপাশি গোল করার চেয়ে করানোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া… ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-র দৌড়ে হয়তো মেসি-রোনালদোর ‘দ্বৈতাধিপত্যে’র শেষ দেখতে চলেছে ফুটবল। বাক্যটা কেমন দীর্ঘশ্বাস জাগায়, না?

২০১৯/২০ মৌসুমে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু-র সেরা পাঁচ

গোল পয়েন্ট নাম
৩৬ ৭২ সিরো ইম্মোবিলে, লাৎসিও
৩৪ ৬৮ রবার্ট লেভানডফস্কি, বায়ার্ন মিউনিখ
৩১ ৬২ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, জুভেন্টাস
২৮ ৫৬ টিমো ভের্নার, লাইপজিগ
২৫ ৫০ লিওনেল মেসি, বার্সেলোনা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here