মুখ আর মুখোশের গল্প

0
82

আমাদের দেশে এবার ঘরের বাইরে সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হলো। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মুখ মুখোশে (মাস্ক) ঢাকার নির্দেশ ছিল। দেশে এত দিনে মাস্ক পরা সরকার অবশ্যকরণীয় করলেন। নির্দেশ দিতে দেরি হলেও তা সাধুবাদ পাবে।

অনেকে এই নিয়ম মানতে চান না। মুখ–নাক ঢাকলে গরম লাগে, শ্বাস নেওয়া যায় না, এ রকম ওজর–আপত্তি। কিন্তু তবু পরতেই হবে, নিজেকে আর অন্যকে করোনা থেকে রক্ষা করার জন্য। এটা সবার প্রায় জানা, তবু ঢিলেঢালা ভাব। ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া কমাতে এই অভ্যাস করতে হবে। তাই ব্যক্তিগত পছন্দ বা স্বাধীনতা এখানে গৌণ।

মাস্ক পরার এই চল বা আচার নতুন না হলেও সময় সময় মাস্কের বিরুদ্ধে ছিল এমন জনরব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কিছু ছবি, প্রবন্ধ, প্রচারচিত্র থেকে দেখা যায়, সে সময় ব্রিটিশ সরকার টিউবস্টেশনে ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা জমায়েতে লোকদের ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষার জন্য মুখে–নাকে মাস্ক পরার নির্দেশ দিয়েছিল। ১৯৪০-৪১ সালে জার্মান বোমা থেকে রক্ষা পেতে এমন জনসমাবেশ হতো ভূগর্ভস্থ রেলস্টেশনে। তখন বেশ চালু ছিল এমন ব্যবস্থা। জনগণও মেনে নিল। নানান স্টাইলের মাস্ক বেরোল, বিটলসের সদস্যরা ধোঁয়াশা এড়াতে পরতেন মাস্ক।

এই করোনাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে আপত্তি করেছিলেন মাস্ক পরার ব্যাপারে, পরে আমতা আমতা করে এখন মেনে নিয়েছেন আর নিজেও পরেছেন। স্প্যানিশ ফ্লু মারির সময় ১৯১৮ সালে মাস্ক পরা হতো। ১৯৩০ সালে এল ব্রিটেনে। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ঐতিহাসিক প্রফেসর থমাস স্লিচ বলেন, জানামতে স্প্যানিশ ফ্লুর সময় প্রথম জনগণের জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হয় নিজের আর অপরের সুরক্ষার জন্য। আর বেশি কড়াকড়িতে তা আরোপ করা হয় সান ফ্রান্সিসকোতে।

ইতিহাসে মাস্কের ব্যবহার আরও পুরোনো। প্রফেসর স্লিচ বলেন, বাজে গন্ধ এড়াতে মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকার চল ছিল। লোকে মনে রাখত, দুর্গন্ধ থেকে রোগ ছড়ায়। প্লেগ চিকিৎসকদের অদ্ভুত পোশাক, পাখির ঠোঁটের মতো লম্বা ঠোঁট, হাতে লাঠি, ধীরগতিতে চলা—অনেকেই দেখেছেন এই ছবি। মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এমন পরিধেয়।

১৮৯৭ সালে এসেছিল আজকালকার মতো মাস্ক। চিকিৎসাক্ষেত্রে পেশাজীবীরাও জীবাণু সংক্রমণের ব্যাপারে সচেতন–সতর্ক হলেন বেশি। সংস্কৃতিভেদে মুখ আর মুখোশের ব্যবহার ছিল দেশে দেশে সময় সময়।

এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিজ্ঞানীরা ও নানা দেশপ্রধান স্বীকার করছেন, মাস্ক পরা কোভিড ১৯–এর বিস্তার রোধে অনেক সহায়ক। প্রথম যখন মাস্ক পরা শুরু হলো, তখন জনগণ বেশ মেনে নিলেন, পরে মনে পেলেন সুখ। ৯০ শতাংশ লোক পরতেন মাস্ক। প্রথম ধাক্কা চলে গেল। জনগণ মাস্ক পরা ছেড়ে দিল। মাস্ক পরা অনেকে মনে করলেন মজার ব্যাপার। গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন না। এরপর এল দ্বিতীয় ঢেউ। কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। মাস্ক পরা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই।

মাস্ক, এশিয়া আর কোভিড–১৯

এশিয়ার অনেক দেশে সার্স, মার্সের পর থেকে শ্বাসযন্ত্রের অসুখ, ফ্লু বা ঠান্ডা লাগলে মাস্ক পরলেন অনেকে। মহামারি শুরুর পর থেকে আবার মাস্ক। যেসব দেশে কন্টাক্ট ট্রেসিং আর দ্রুত সারার ব্যাপার ঘটে, সেসব দেশের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখলেন, যেসব অঞ্চলে লোকে মাস্ক পরেনি, সেখানে সংক্রমণ বেশি।

তেমন কথা জানতেন একজন, ডা. উ লিন-তেহ। চীনা চিকিৎসক, প্লেগযোদ্ধা বলে জগৎজোড়া নাম হয়েছিল তাঁর, প্রথম চীনা নাগরিক, যিনি বিশ্বে সবার মাস্ক পরার প্রবক্তা ছিলেন।

১৯১০ সালে মাঞ্চুরিয়ান প্লেগ থেকে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ রক্ষার পর উ লিন-তেহকে মনোনীত করা হয় চিকিৎসায় নোবেলের জন্য। তিনি নানা তথ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে তত্ত্ব দাঁড় করালেন, এটি ছড়ায় শ্বাস, কফ, কাশি ও থুতুর মাধ্যমে, ইঁদুর বা রক্তপায়ী ক্ষুদ্র কীটের মাধ্যমে নয়। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা অবিশ্বাস করলেন যথারীতি। এলেন জিয়ার ডা. মেসনে নামের ফরাসি চিকিৎসক। ভাবখানা এমন যে এশিয়ার ডাক্তার এই গুরুতর ব্যাপার বুঝবে কি? অবশ্য ডা. উ লিন তাঁকে বললেন সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য তুলা আর পশমের তৈরি মাস্ক পরতে। তিনি উকে পরোয়া করলেন না। রোগী দেখলেন মুখ–নাক খোলা রেখে, এরপর তিনি মারা গেলেন নিউমোনিক প্লেগে। তাই মাস্ক কিন্তু পরবেন সবাই বাইরে গেলে। মনে থাকে যেন। আর তো কিছুদিনমাত্র। তারপর আবার জমবে মেলা হাটে–ঘাটে–বন্দরে, বটের তলায়।

তখন পরবেন মুখোশ নাটকের মঞ্চে, শিল্পকলার মঞ্চে বা বৈশাখী মেলায়। জীবাণু ঠেকাতে নয়। মনের আনন্দে। ফুরফুরে ভাব বোঝাতে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here