ভোট জালিয়াতির পরিণতি বরণ করছেন লুকাশেঙ্কো

0
74

বেচারা লেবানন! পাশের দেশ সিরিয়া থেকে আসা ১০ লাখের বেশি শরণার্থীর বোঝা মাথায় নিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করে যাচ্ছিল দেশটি। ঠিক এ রকম একটি সময় বৈরুতের বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হলো। তাতে দেড় শর বেশি মানুষ মরল। আহত হলো ছয় হাজারের বেশি। একসময় যে দেশটিকে বলা হতো মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস, সেখানে এখন তিন লাখ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ লোকই গৃহহীন। এই দেশের সামনে আরও কী ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

লেবাননের বৈভব ও ঐশ্বর্যের ঝিলিক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ, বেপরোয়া দুর্নীতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। সর্বশেষ ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আরব বসন্তের মতো স্লোগান দিয়েছে, ‘আল শা’ব ইউরিদ ইশকাত আল নিজাম (জনতা ক্ষমতাসীনের পতন চায়)’। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি অবস্থা দিয়েও কাজ হয়নি। সরকারের পতন হওয়ার পরও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।

২০০৫ সালে নিহত হওয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যা মামলার রায় আজ ১৮ আগস্ট ঘোষণা করবে হেগের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর লেবানন। ওই আদালতে ইরান ও সিরিয়ার মদদপুষ্ট শিয়া মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক দল হিজবুল্লাহর চার সদস্যের বিরুদ্ধে এ রায় দেওয়া হবে। আসামিদের অনুপস্থিতিতেই এ মামলা চলেছে এবং তাঁদের অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হবে। ৭ আগস্ট রায়টি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই তারিখের তিন দিন আগে বৈরুতে বিস্ফোরণ ঘটে। আদালত সেদিকে নজর দিয়ে রায়ের তারিখ পিছিয়েছেন।

আদালতের রায় যা-ই হোক না কেন, দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তাপ যে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) যে হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী তালিকায় রেখেছে, সেই হিজবুল্লাহ লেবাননে শিয়া সম্প্রদায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। হিজবুল্লাহর সেনাশক্তি লেবাননের সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। পার্লামেন্টেও তাদের শক্তিশালী একটা অংশ রয়েছে।

ফিলিস্তিনি গেরিলারা যেভাবে ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র কায়েম’ করার কারণে গৃহযুদ্ধ চলেছে, ঠিক সেভাবে হিজবুল্লাহর ‘রাষ্ট্রের বাইরের আরেক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা দেশটিতে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। লেবাননের ভেতরের রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং বাইরের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশটিতে মেধা নয়, বরং ধর্মীয় ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে।

কিন্তু যে জনতা ‘ক্ষমতাসীনের পতন চায়’, তারা কি ক্ষমতাসীনের পতনে মুক্তি পাবে?

১৯৪৩ সালের এক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের প্রেসিডেন্ট হন একজন খ্রিষ্টান, প্রধানমন্ত্রী হন একজন সুন্নি মুসলমান এবং পার্লামেন্টের স্পিকার হন একজন শিয়া মুসলমান।

লেবাননের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রিয়াদ আল-সোলের নীতি ছিল ‘লেবাননের মুসলমানদের লেবানিজ এবং লেবাননের খ্রিষ্টানদের আরব করতে হবে’। অর্থাৎ মুসলমানরা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরব পরিচয় থেকে সরে এসে লেবানিজ পরিচয় বরণ করবে এবং খ্রিষ্টানরা পশ্চিমা সংস্কৃতি ছেড়ে লেবানিজ অর্থাৎ আরব ঘরানার লেবানিজ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হবে।

একসময় দেশটিতে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের সংখ্যা সমান সমান ছিল। কিন্তু গৃহযুদ্ধের সময় খ্রিষ্টানদের চলে যাওয়া ও মুসলমানদের জন্মহার বেশি থাকার কারণে খ্রিষ্টানরা সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। সেখানে এখন তাদের সংখ্যা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।

এখন বিক্ষোভকারীরা সমঝোতাভিত্তিক ক্ষমতা ভাগাভাগি ও বিদেশিদের হস্তক্ষেপের অবসান চাইছে। আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরান দীর্ঘদিন লেবাননের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। এর আগে এই তালিকায় সিরিয়াও ছিল। তবে রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডের পর সিরিয়াকে ‘লেবাননের রক্ষাকারী’ দেশের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

বিক্ষোভকারীরা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাইছে। কূটাভাস হলো, তারা লেবানন থেকে বিদেশি শক্তির প্রভাব সরিয়ে নিতে বললেও ভেতরে-ভেতরে আরও বড় ধসের আশঙ্কা করছে। ‘পৃষ্ঠপোষক’ দেশগুলো যদি সরে যায়, তাহলে আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হবে। বেকারত্ব বেড়ে যাবে। আক্রোশ প্রশমন হবে না, আরও বেড়ে যাবে। অতএব আপাতত কোনো সমাধান নেই।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here