গরিবের চালে ধনীর থাবা: সাড়ে চার লাখ ভুয়া কার্ড বাতিল

0
51

সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজান ইউনিয়নের চরজাজুরিয়া গ্রামের শ্রমিক পিয়াস। তার ‘খাদ্যবান্ধব’ কর্মসূচির (১০ টাকা কেজি দরের চাল) কার্ড নম্বর-৫৫৩। বাস্তবে এই নামে কোনো ব্যক্তি নেই ওই গ্রামে। ২০১৬ সাল থেকে এই নামে চাল তুলছেন সংশ্লিষ্ট ডিলার আবদুস সালাম। সরকারি ওয়েবসাইটে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় পিয়াসের নামের পাশে একটি মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া আছে। ওই নম্বরে ফোন করলে ধরেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। যিনি ঘোরজান ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আবদুস সালামের ফুপাতো ভাই।

জানতে চাইলে ওই ব্যাংক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, তার গ্রামের বাড়ি চৌহালী সদরে। ঘোড়জান ইউনিয়নের ডিলার আবদুস সালাম তার মামাতো ভাই। তিনিই হয়তো তার মোবাইল ফোন নম্বরটি ওই তালিকায় দিয়ে থাকতে পারেন। কারণ সালামের কাছেই তার মোবাইল নম্বর আছে। গত দুই বছর তিনি এলাকায় যাননি বলেও জানান। পিয়াসের মতো একই ইউনিয়নের রেহাইকাউলিয়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। তালিকায় দেয়া তার মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিলে বলছে ‘নম্বরটি আর ব্যবহার হচ্ছে না’।

শুধু ঘোরজান ইউনিয়নেই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় প্রবাসী, সচ্ছল ও অস্তিত্বহীন প্রায় একশ মানুষের নাম রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করতে চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ঘোরজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রমজান আলী।

সিরাজগঞ্জের মতো ভুয়া কার্ডের ছড়াছড়ি রয়েছে রংপুরেও। জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার ময়েনপুর ইউনিয়নের এরশাদুল ও গোলাম মোস্তফা কাজের সুবাদে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসেবে তাদের নামেও একটি করে কার্ড ছিল, যা তারা জানতেন না। তবে কার্ডের বিপরীতে আসা খাদ্য সহায়তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেরাই ভোগ করছিলেন। সম্প্রতি সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

শুধু সিরাজগঞ্জের চৌহালী বা রংপুরের মিঠাপুকুর নয়, প্রায় সারা দেশেই এভাবে নয়ছয় করে সুবিধা ভোগ করছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। করোনাকালে অনেক স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে এসব চালসহ আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অনিয়ম ও দুর্নীতির অপরাধে এ পর্যন্ত ১১৫ জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। অনেকের নামে দুদকে মামলাও হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৭০ জন ইউপি সদস্য, ২ জন জেলা পরিষদ সদস্য, ৪ জন পৌর কাউন্সিলর এবং একজন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এসব ভুয়া কার্ড শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয় খাদ্য অধিদফতর। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এই তালিকাটি হালনাগাদ করছে। এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার ১২৪টি ভুয়া কার্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ময়মনসিংহে রয়েছে ৫০ হাজার ৫০০, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৮ হাজার, বগুড়ায় ১৪ হাজার, টাঙ্গাইলে ১২ হাজার ৩৯৩, নওগাঁয় ১১ হাজার ২৬৩, জামালপুরে ৮ হাজার ৫৬৮, কুড়িগ্রামে ৯ হাজারের মতো। ইতোমধ্যে এসব কার্ড বাতিল করা হয়েছে।

যা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়স্বজন, মৃত ব্যক্তি, সচ্ছল পরিবার, গ্রামে বসবাস করে না, আবার কারও নামের কার্ড থাকলেও সে ব্যক্তি জানে না এরকম ব্যক্তিদের নামের কার্ড। এসব কার্ডের বিপরীতে সরকারি সহায়তা দীর্ঘদিন দরে আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। এসব কার্ড বাতিল করে নতুন করে আরও ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫৫টি কার্ড প্রকৃত দরিদ্রদের নামে করা হয়েছে। রংপুর ও শেরপুরে নতুন করে তালিকা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কয়েক লাখ ভুয়া কার্ড বাতিল করা হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা কমিটি প্রকৃত গরিবদের নামে নতুন করে কার্ড ইস্যু করছে।’

জানা গেছে, সারা দেশে কী পরিমাণ ভুয়া কার্ড রয়েছে, তা খুঁজতে নির্দেশ দেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি গত মার্চে সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি-ফুড) কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বেনামি বা ভুয়া কার্ড জনপ্রতিনিধি-ডিলারসহ কারও কাছে থাকলে তা দ্রুত জমা দিতে হবে।

এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এরপর গত ১১ জুন চট্টগ্রাম বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, দুর্নীতি রোধে প্রয়োজনে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের কার্ড ডিজিটালাইজড করা হবে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের তালিকা নিয়ে কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই সেগুলো হালনাগাদ করতে সব ডিসি ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চিঠি দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, প্রকৃত গরিব ও দুস্থদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা প্রস্তুত করতে। এরই ধারাবাহিকতায় এই ভুয়া কার্ড বাতিল করেছে খাদ্য অধিদফতর।

২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘খাদ্যবান্ধব’ কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে ‘খাদ্যবান্ধব’ কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

প্রতিবছর মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর- পাঁচ মাস এ কর্মসূচির সময় নির্ধারণ করা হয়। নারী, বিধবা ও প্রতিবন্ধী নারীপ্রধান পরিবারকেই প্রাধান্য দেয়ার কথা। কিন্তু ‘বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’- স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির ডিলার নিয়োগ ও চাল বিতরণের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

নীতিমালা উপেক্ষা করে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের। আর হতদরিদ্রের তালিকায় রয়েছে আবাসিক হোটেল মালিক, মহাজন ও দলীয় নেতাকর্মী। এমনকি কোনো কোনো স্থানে মৃত ও প্রবাসী ব্যক্তির নামেও ইস্যু করা হয় সুবিধাভোগীর কার্ড। সরকারি একাধিক তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here